দিরাই-শাল্লা,উন্নয়ন চাই,না এম.পি. চাই——-অহিদ উদ্দীন


Sylheter samachar24 প্রকাশের সময় : অগাস্ট ৮, ২০২৬, ১০:৪৭ অপরাহ্ন /
দিরাই-শাল্লা,উন্নয়ন চাই,না এম.পি. চাই——-অহিদ উদ্দীন

দিরাই শাল্লা, উন্নয়ন চাই না এমপি চাই
অহিদ উদ্দীন

বাংলাদেশ ২০২৪ সালের এক বিশাল রাজনৈতিক ঝড় এবং ২০২৬ সালের নতুন সাধারণ নির্বাচন প্রত্যক্ষ করেছে। দেশের মানুষের আশা ছিল, সুশাসন আর জবাবদিহিতার সুবাতাস বইবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, সুনামগঞ্জ-২ (দিরাই-শাল্লা) আসনের সাধারণ মানুষের জন্য এই পরিবর্তন কোনো নতুন ভোরের বার্তা বয়ে আনেনি, বরং তা পুরনো বঞ্চনার ক্ষতকে আরও গভীর করে তুলেছে। যে হাওরপাড়ের মানুষ পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে উন্নয়ন ও মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত, তারা আজ এক অদ্ভুত ও মেরুদণ্ডহীন রাজনীতির জাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে।

দিরাই-শাল্লার বর্তমান রাজনৈতিক চিত্রটি দেশের সার্বিক পরিস্থিতির চেয়ে খুব একটা আলাদা নয়। ২০২৬ সালের নির্বাচনের পর আমরা দেখেছি ক্ষমতার নতুন অংশীদারদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ কামড়াকামড়ির মহোৎসব। ফরিদপুরে কেন্দ্রীয় নেতাদের কোন্দলে প্রাণহানি, কুষ্টিয়া ও নারায়ণগঞ্জে আধিপত্যের লড়াইয়ে প্রকাশ্য অস্ত্রের মহড়া কিংবা বরিশালে ত্যাগী নেতাদের বাদ দিয়ে পকেট কমিটি গঠনের যে চিত্র, তা কি প্রমাণ করে? প্রশ্ন আপনাদের কাছে।

আমাদের মতে দিরাই-শাল্লার সংকটটি দেশের অন্য যেকোনো এলাকার চেয়ে বেশি ভয়াবহ, নাটকীয় এবং ঐতিহাসিক। দেশের অন্য এলাকায় যেখানে দুই গ্রুপের আদর্শিক বা কৌশলগত দ্বন্দ্ব থাকে, সেখানে দিরাই-শাল্লায় দ্বন্দ্ব রূপ নিয়েছে নির্বাচিত বর্তমান সংসদ সদস্য নাছির উদ্দিন চৌধুরী ও তার সৎ ভাই উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মাসুক চৌধুরীর মধ্যে।

দুই ভাইয়ের ক্ষমতার দ্বন্দ্বে পুরো দিরাই-শাল্লা আজ দুই ভাগে বিভক্ত। তার ওপর, গত ৬ আগস্ট দিরাই থানা পয়েন্টের এক সমাবেশে অসুস্থ এমপি নাছির চৌধুরীর সেই নজিরবিহীন বক্তব্য “আওয়ামী লীগ আমাদের শত্রু নয়, মিত্র… অচিরেই তারা বিএনপিতে মিশে যাবে” পুরো অঞ্চলের সচেতন মানুষকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। যে দলটির বিরুদ্ধে লড়াই করে ছাত্র-জনতা এত রক্ত দিল, সেই দলটিকে নিজেদের স্বার্থে ‘মিত্র’ বানানো এবং তাদের ভোট নিজের পকেটে তোলার এই আপসকামিতা কি সুস্থ রাজনীতির লক্ষণ? নাকি এটি স্রেফ সুযোগসন্ধানী আধিপত্যের নোংরা খেলা?

আজকের বিএনপির এই আত্মঘাতী কোন্দল দিরাই-শাল্লার মানুষকে এক ভয়ানক ও রক্তক্ষয়ী অতীতের কথা মনে করিয়ে দেয়। অতীতে আওয়ামী লীগের ভেতরের তীব্র দলীয় কোন্দলের কারনে প্রকাশ্য দিবালোকে বন্দুকের গুলিতে আমাদের সবার পরিচত নান্টু রায়ের মৃত্যুর কথা কি ভুলে গেছি? দল বদলেছে, ক্ষমতার চেয়ারে বসা মানুষের রঙ বদলেছে কিন্তু দিরাই-শাল্লার রাজনীতির সেই আদিম ও হিংস্র চরিত্র কি বদলেছে?

আজ ২০২৬ সালে এসে বিএনপির ভাইয়ে-ভাইয়ে যে সংঘাত আমরা দেখছি, তা মূলত সেই নান্টু রায় হত্যাকাণ্ডের মনস্তাত্ত্বিক চোরাবালির দিকেই এগোচ্ছে নাত? ইতিহাস থেকে আমরা শিক্ষা নেইনা, তাই একই কলঙ্কিত ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটে বারবার।

দিরাই-শাল্লার সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, আমাদের এমপি অসুস্থ, রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা এবং পারিবারিক কোন্দলে জর্জরিত। এমতাবস্থায় এমপির পক্ষে ঢাকায় সচিবালয়ে গিয়ে দিরাই-শাল্লার মেগা প্রকল্পের জন্য লড়াই করা কিংবা প্রত্যন্ত হাওরের কাদা-পানিতে নেমে উন্নয়ন কাজ তদারকি করা এক অবাস্তব কল্পনা। আর এই শূন্যতার সুযোগ নিচ্ছে আমাদের স্থানীয় প্রশাসন। বাংলাদেশে আমলারা ঐতিহ্যগতভাবেই ক্ষমতার খচ্চর বা চাটুকার হিসেবে পরিচিত। যখন কোনো এলাকায় রাজনৈতিক নেতৃত্ব দুর্বল বা ধ্বজভঙ্গ হয়, তখন আমলারা এলাকার অলিখিত রাজা মনে করতে শুরু করেন।

দিরাই-শাল্লার বর্তমান বাস্তবতায় টিআর, কাবিখা, রাস্তাঘাটের টেন্ডার কিংবা ফসল রক্ষা বাঁধের কোটি কোটি টাকার বরাদ্দ আজ এক শ্রেণীর ছায়া নেতৃত্ব এবং লুটেরা আমলাতন্ত্রের পকেটে চলে যাচ্ছে। রাজনৈতিক কোন্দলকে উসকে দিয়ে প্রশাসন আজ নিজেরা জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে উঠে যাচ্ছে নাত? যার কারণে কাজ আটকে থাকা, রাস্তাঘাট জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে থাকা, আর প্রতি বর্ষায় কৃষকের একমাত্র সোনালী ফসল তলিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে?

দিরাই-শাল্লার মানুষ গত পাঁচ দশকের উপরে অনেক বঞ্চনা শিকার হয়েছে।
আর কত? এই প্রশ্নের উত্তর নেতাদের কাছে নেই, এই উত্তর তৈরি করতে হবে দিরাই-শাল্লার সাধারণ মানুষকেই
রাজনীতিবিদরা অসুস্থ হতে পারেন, আমলারা ক্ষমতার খচ্চর হতে পারেন কিন্তু জনগণ?

সম্মিলিত শক্তির চেয়ে বড় কোনো শক্তি এই পৃথিবীতে নেই। আমলারা ততক্ষণই অহংকার দেখায়, যতক্ষণ জনগণ ঘুমিয়ে থাকে। দিরাই-শাল্লার প্রবাসী সমাজ, সচেতন তরুণ এবং ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষকে এখন দলকানা মানসিকতা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। রাস্তাঘাট, হাসপাতাল কিংবা বাঁধের অনিয়ম রুখতে কোনো রাজনৈতিক ব্যানার ছাড়া হাওর বাঁচাও এর মতো অরাজনৈতিক জোটে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। হাতের স্মার্টফোনকে অস্ত্র বানিয়ে প্রশাসনের প্রতিটি অবহেলা ও দুর্নীতিকে সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল করতে হবে, যেন ঢাকার উচ্চমহল নড়েচড়ে বসতে বাধ্য হয়। নেতাদের স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে দলের দোহাই দিয়ে আর পার পাবেন না, কাজ যে করবে, ভোট সে-ই পাবে।

নেতারা দল নিয়ে ব্যস্ত থাকুক, কিন্তু দিরাই-শাল্লার মাটিকে বাঁচাতে হলে এখন সাধারণ মানুষকেই উন্নয়নের মূল পাহারাদার ও চালক হতে হবে। ঘুম ভাঙার সময় এখনই, কারণ পাঁচ দশকের উপরে বঞ্চনা আর এক মুহূর্তও সইবার শক্তি এই হাওরপাড়ের মানুষের নেই। পরিবর্তন তখনই আসবে যখন আমরা নিজরা পরিবর্তন হব, নইলে নয়।