
ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েও সম্পূর্ণ নির্দোষ প্রমাণিত হয়েই রাজনীতিতে স্বগৌরবে ফিরে আসার বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন প্রয়াত জাতীয় নেতা বাবু সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত
নিজস্ব প্রতিবেদকঃ-
১৯৪৫ সালে জন্ম নেওয়া সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত “১৯৭০ সালের নির্বাচনে মাত্র ২৫ বছর বয়সে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যু’দ্ধে সরাসরি অংশ গ্রহণ করা এই রাজনীতিকের সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল সংবিধান এবং আইন বিশেষজ্ঞ হিসেবে।
মুক্তিযুদ্ধের পর স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন কমিটির একজন কনিষ্ঠ সদস্য ছিলেন তিনি। বনার্ঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত মোট ৭ বার সুনামগঞ্জের একটি আসন থেকে জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। প্রায় ৫৫ বছর রাজনীতিতে সক্রিয় থেকে রেলমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছিলেন কিন্তু মাত্র সাড়ে চার মাসের মাথায় তাকে যে ষড়যন্ত্রের শিকার হতে হয়, সেই সত্যই আজ তুলে ধরার চেষ্টা করছি।
সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ২০১১ সালের ২৮শে নভেম্বর রেলমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন।
শপথ নিয়েই তিনি বাংলাদেশ রেলওয়েতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থানের কথা তুলে ধরেছিলেন। এমনকি তিনি মন্তব্য করেছিলেন “রেলওয়েতে কালো বি’ড়াল রয়েছে এবং তা খুঁজে বের করা হবে।” এই কথাটিই উনার জীবনে কাল হয়েছিল।
৯ই এপ্রিল ২০১২ সালের গভীর রাত, সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের এপিএস ওমর ফারুক এবং রেলের দুজন কর্মকর্তাকে নিয়ে প্রায় ৭০ লক্ষ টাকা সহ পূর্ব পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ওই গাড়ির ড্রাইভার আলী আজম বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ বা বিজিবি সদর-দপ্তরে গাড়িটা ঢু’কিয়ে দেয়।
ঢাকার বিজিবির সদর-দপ্তর পি’লখানার মূল ফটকে এই বিপুল পরিমাণ টাকা সহ তৎকালীন রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তর সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) ওমর ফারুক তালুকদার, রেলওয়ের তৎকালীন পূর্বাঞ্চলীয় মহাব্যবস্থাপক (জিএম) ইউসুফ আলী মৃধা ও রেলের নিরাপত্তা বাহিনীর কমাড্যান্ট এনামুল হক আ/টক হন। ওই সময় মিডিয়া সহ চারদিকে রটিয়ে দেওয়া হয় তারা এই টাকা নিয়ে রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের বাড়িতে যাচ্ছিলেন। অথচ টাকা-গুলো ছিল সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের এপিএস ওমর ফারুক তালুকদারের ব্যক্তিগত এবং সেইদিন এই টাকা সহ গাড়ি আ/টক করলেও পরে সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করে ছেড়ে দেওয়া হয়। এবং পরদিন টাকা-গুলো ওমর ফারুক নিজ একাউন্টে জমাও করে। কিন্তু ড্রাইভার আলী আজমের বদান্যতায় মিডিয়া সহ চারদিকে হৈ হৈ রৈ রৈ পড়ে গেল। ঘটনার পর ড্রাইভার আলী আজম গা ঢাকা দিয়ে অজ্ঞাত স্থানে চলে গেল। মিডিয়া খবর ছড়ালো, আলী আজম নি/খোঁজ, তাকে তন্ন তন্ন করেও বাংলাদেশের কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছেনা। যাইহোক, একজন দায়িত্বশীল মন্ত্রী হিসেবে এই ঘটনার কারণে দিন কয়েকের মধ্যে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত তাৎক্ষণিকভাবে দুইটি শক্তিশালী তদন্ত কমিটি গঠন, রেলওয়ের তৎকালীন পূর্বাঞ্চলীয় মহাব্যবস্থাপক (জিএম) ইউসুফ আলী মৃধা ও রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর কমান্ড্যান্ট এনামুল হক-কে বরখাস্ত করা ও তাঁদের দুজনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করার সিদ্ধান্ত। এপিএস ওমর ফারুক তালুকদার-কে বরখাস্ত এবং সে আর তার স্ত্রী মারজিয়া ফারজানার সব ধরনের ব্যাংক হিসাব জ’ব্দ করার নির্দেশ সহ কিছু যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিলেন যা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নজির বিহীন। কিন্তু যেসব কালো বি’ড়াল মন্ত্রীর পদ থেকে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে সরিয়ে রেলওয়েকে লু/টে পু/টে খাওয়ার ষড়যন্ত্রে ছিল এবং তাদের আজ্ঞাবহ মিডিয়া সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত কে মন্ত্রীর পদ থেকে সরানোর একটা গোপন মিশন নিয়ে কাজ করছিল তারা কিন্তু সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের পিছনে লেগেই ছিল। পত্র-পত্রিকায় টেলিভিশন টকশোতে নিয়মিত সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বিরোধী প্রচার প্রচারনাও অব্যাহতভাবে চলতে লাগলো।
১৬ই এপ্রিল ২০১২ সাল। ঢাকার রেলভবনে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এই ঘটনায় পদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে প্রয়াত সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেন “গাড়িতে টাকা পাওয়ার ঘটনার সাথে তাঁর ব্যক্তিগত স্টাফ এবং রেলওয়ের দু’জন কর্মকর্তার নাম এসেছে, যা নিয়ে জাতীয় গণমাধ্যমে, সুশীল সমাজে এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। এই দায়িত্ব অবশ্যই আমাদের মন্ত্রণালয়ে বর্তায়। যদিও আমি দৃঢ়ভাবে বলতে চাই ঐ ঘটনার সাথে আমার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ, কোনোভাবেই কোন সম্পর্ক ছিল না, তারপরও এই ব্যর্থতার দায় দায়িত্ব নিয়ে আমি রেলমন্ত্রীর পদ থেকে অব্যাহতি নিচ্ছি।” স্বাধীন বাংলার ইতিহাসে বাংলাদেশের কোন মন্ত্রী নিজের এপিএস আর কর্মকর্তাদের বিতর্কিত কর্মকান্ডের দায় স্বীকার করে পদত্যাগ করার ঘটনা ওটাই ছিল প্রথম এবং শেষ। এখানে একটা কথা এড়িয়ে গেলে ভুল হবে। রেলমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করলেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বুঝতে পেরেছিলেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ষড়যন্ত্রের শিকার, আর তাই পদত্যাগের মাত্র একদিনের মাথায় সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে আবারও প্রধানমন্ত্রী রুলস অব বিজনেস ১৯৯৬-এর ধারা ৩(৪)-এর ক্ষমতাবলে দপ্তরবিহীন মন্ত্রী করা হয়। দপ্তরবিহীন মন্ত্রী করা হলেও এই ঘটনার সুষ্ঠ তদন্তের স্বার্থে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বহুদিন রাজনীতি থেকে নিজেকে দূরে রেখেছিলেন। তবুও একশ্রেণির মিডিয়া তখনও সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের পিছু ছাড়েনি। শুধু সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত নয়, উনার একমাত্র ছেলে সৌমেন সেনগুপ্ত সহ পরিবার নিয়েও নানা দূর্নীতির কল্পকাহিনী ফাঁদা আরম্ভ করলো। অর্থাৎ একজন সাদা মনের মানুষকে তার পরিবার পরিজন সহ কিভাবে মানসিক নির্যাতনের মধ্যে দিন কাটাতে হয়, সেটা সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে দেখে ভালোভাবেই শিক্ষা পেয়েছিলাম। মিডিয়ায় প্রকাশিত সব ঘটনা নিয়ে যথারীতি দুর্নীতি দমন কমিশনের মাধ্যমে তদন্ত হলো, সেই তদন্তে প্রয়াত সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত এবং উনার ছেলে সৌমেন সেনগুপ্ত সম্পূর্ণ নির্দোষ প্রমাণিত হন। একটা অভিযোগও এই তদন্তে সত্য বলে প্রমাণ হয়নি। তদন্তে নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ার পর রাজনীতিতে তিনি আবারও সক্রিয় হন এবং ২০১৭ সালের ৫ ই ফেব্রুয়ারী মৃ/ত্যুর পূর্ব পর্যন্ত আওয়ামী’লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন।
আপনার মতামত লিখুন :